ঢাকা    শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬
নেত্রবার্তা

কবি দেবব্রত দাস এর কবিতা



কবি দেবব্রত দাস এর কবিতা

‘পাঁচটি সূর্যাস্ত’ — দেবব্রত দাস

সমকালীন বাংলা কবিতায় ক্ষুদ্র পরিসরে গভীর ভাবনার বিস্তার ঘটানোর যে প্রবণতা দেখা যায়, ‘পাঁচটি সূর্যাস্ত’ তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। পাঁচটি পৃথক অংশে বিন্যস্ত এই কবিতাগুলো প্রথম দর্শনে স্বতন্ত্র মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে তারা একই অস্তিত্ব-জিজ্ঞাসা, সময়বোধ এবং মানবজীবনের অন্তর্গত শূন্যতার সূত্রে গাঁথা।


প্রথম কবিতায় ভালোবাসাকে এক অলৌকিক শক্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে—যে ভালোবাসার কাছে দিগন্তও ঘরে ফিরে আসে, নদীও থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু কবি তাড়াহুড়ো করেন না; তিনি আরও কিছু সময় কাটাতে চান ‘ঘাসের বাড়িতে’। এখানে ঘাসের বাড়ি যেন প্রকৃতি, নির্জনতা কিংবা আত্ম-অন্বেষণের এক প্রতীকী আশ্রয়।

দ্বিতীয় কবিতায় ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক বাস্তবতার একটি মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে উঠেছে। ‘পোয়াতী হওয়া’ এখানে শুধু মাতৃত্বের ইঙ্গিত নয়, বরং উত্তরাধিকার, বংশবিস্তার এবং সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষারও প্রতীক। বয়সের ভার এবং অপূর্ণতার বেদনা কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতেই তীব্র হয়ে ওঠে।

তৃতীয় কবিতাটি কল্পনা ও বাস্তবতার সীমানা ভেঙে দেয়। কবির আঁকা আকাশ উল্টে দিতেই বৃষ্টি নেমে আসে—এ যেন সৃজনশীলতার এমন এক জগৎ, যেখানে চিন্তাই বাস্তবতাকে জন্ম দেয়। ‘উল্টো আকাশের খনি’ পঙ্‌ক্তিটি কবিতার সবচেয়ে স্মরণীয় চিত্রকল্পগুলোর একটি।

চতুর্থ কবিতায় সূর্যাস্ত কেবল দিনের অবসান নয়; এটি মৃত্যু, ক্ষয় এবং সময়ের অনিবার্য পরিণতির রূপক। ‘মৃত রাত্রির মরদেহ’ এবং ‘চিতা সাজাতে ব্যস্ত কয়েকজন’—এই দৃশ্যকল্প কবিতাটিকে এক ধরনের অতিবাস্তব আবহ দেয়।

পঞ্চম কবিতাটি সবচেয়ে সরাসরি সামাজিক ভাষ্য বহন করে। ভোগবাদী সমাজে সবকিছু যখন পণ্যে পরিণত হচ্ছে, তখনও ‘সবুজ শৈশব’ এবং ‘খয়েরী মৃত্যু’ অধরা থেকে যায়। জীবনের সবচেয়ে মৌলিক অভিজ্ঞতাগুলোর কোনো বাজারমূল্য নেই—কবি এই গভীর সত্যটিই ব্যঙ্গ ও বেদনার মিশেলে তুলে ধরেছেন।

সব মিলিয়ে, ‘পাঁচটি সূর্যাস্ত’ একাধারে প্রেম, সময়, মৃত্যু, স্মৃতি এবং মানব অস্তিত্বের বহুমাত্রিক পাঠ। সংক্ষিপ্ত অথচ তীক্ষ্ণ ভাষা, অভিনব চিত্রকল্প এবং দার্শনিক অন্তর্গত সুর এই কবিতাগুলোকে সমকালীন বাংলা কবিতার পাঠকের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তোলে।


পাঁচটি সূর্যাস্ত

দেবব্রত দাস

১. 

ভালোবাসলে দিগন্ত হেঁটে বাড়ি চলে আসবে জানি

নদীরাও স্থির দাঁড়িয়ে শুনবে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর গান । 

তবে এখনই ভালোবাসবো না

আরও কিছুটা সময় কাটাতে চাই ঘাসের বাড়িতে।

২. 

কবে তুমি পোয়াতী হবে? 

কিছুদিন পরই পঞ্চাশে পা দেবো

সারাপাড়ায় রটে যাওয়া

হৃদয়হীন সন্তানের অভিভাবক নামটা চিরতরে মুছে যাবে।

বলো কবে তুমি পোয়াতী হবে?

৩. 

কাগজে মেঘসর্বস্ব আকাশ আঁকলাম, পাখি আঁকলাম

এবার তাকে উল্টে দিতেই

বৃষ্টি ঝরে পড়লো শরীরে, উঠোনে, বাড়ির ছাদে

মূলত আমার ভাবনায় একটা উল্টো আকাশের খনি আছে।

৪. 

বাড়িজুড়ে সূর্যাস্তের ভিড়।

আমি ভিড় ঠেলে ভেতরে গিয়ে দেখলাম

মৃত রাত্রির মরদেহ পড়ে আছে

পাশেই নদীতীরে চিতা সাজাতে ব্যস্ত কয়েকজন।

৫.

সবকিছু সস্তায় মিলছে

টিভি, ফ্রিজ, আলমিরা, নারী, প্রেম

                               এমনকি ভদকাও।

শুধু দাম একটু বাড়তি আছে সবুজ শৈশব আর খয়েরী মৃত্যুর।

নেত্রবার্তা

শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬


কবি দেবব্রত দাস এর কবিতা

প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬

featured Image

‘পাঁচটি সূর্যাস্ত’ — দেবব্রত দাস

সমকালীন বাংলা কবিতায় ক্ষুদ্র পরিসরে গভীর ভাবনার বিস্তার ঘটানোর যে প্রবণতা দেখা যায়, ‘পাঁচটি সূর্যাস্ত’ তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। পাঁচটি পৃথক অংশে বিন্যস্ত এই কবিতাগুলো প্রথম দর্শনে স্বতন্ত্র মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে তারা একই অস্তিত্ব-জিজ্ঞাসা, সময়বোধ এবং মানবজীবনের অন্তর্গত শূন্যতার সূত্রে গাঁথা।


প্রথম কবিতায় ভালোবাসাকে এক অলৌকিক শক্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে—যে ভালোবাসার কাছে দিগন্তও ঘরে ফিরে আসে, নদীও থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু কবি তাড়াহুড়ো করেন না; তিনি আরও কিছু সময় কাটাতে চান ‘ঘাসের বাড়িতে’। এখানে ঘাসের বাড়ি যেন প্রকৃতি, নির্জনতা কিংবা আত্ম-অন্বেষণের এক প্রতীকী আশ্রয়।

দ্বিতীয় কবিতায় ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক বাস্তবতার একটি মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে উঠেছে। ‘পোয়াতী হওয়া’ এখানে শুধু মাতৃত্বের ইঙ্গিত নয়, বরং উত্তরাধিকার, বংশবিস্তার এবং সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষারও প্রতীক। বয়সের ভার এবং অপূর্ণতার বেদনা কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতেই তীব্র হয়ে ওঠে।


তৃতীয় কবিতাটি কল্পনা ও বাস্তবতার সীমানা ভেঙে দেয়। কবির আঁকা আকাশ উল্টে দিতেই বৃষ্টি নেমে আসে—এ যেন সৃজনশীলতার এমন এক জগৎ, যেখানে চিন্তাই বাস্তবতাকে জন্ম দেয়। ‘উল্টো আকাশের খনি’ পঙ্‌ক্তিটি কবিতার সবচেয়ে স্মরণীয় চিত্রকল্পগুলোর একটি।


চতুর্থ কবিতায় সূর্যাস্ত কেবল দিনের অবসান নয়; এটি মৃত্যু, ক্ষয় এবং সময়ের অনিবার্য পরিণতির রূপক। ‘মৃত রাত্রির মরদেহ’ এবং ‘চিতা সাজাতে ব্যস্ত কয়েকজন’—এই দৃশ্যকল্প কবিতাটিকে এক ধরনের অতিবাস্তব আবহ দেয়।


পঞ্চম কবিতাটি সবচেয়ে সরাসরি সামাজিক ভাষ্য বহন করে। ভোগবাদী সমাজে সবকিছু যখন পণ্যে পরিণত হচ্ছে, তখনও ‘সবুজ শৈশব’ এবং ‘খয়েরী মৃত্যু’ অধরা থেকে যায়। জীবনের সবচেয়ে মৌলিক অভিজ্ঞতাগুলোর কোনো বাজারমূল্য নেই—কবি এই গভীর সত্যটিই ব্যঙ্গ ও বেদনার মিশেলে তুলে ধরেছেন।


সব মিলিয়ে, ‘পাঁচটি সূর্যাস্ত’ একাধারে প্রেম, সময়, মৃত্যু, স্মৃতি এবং মানব অস্তিত্বের বহুমাত্রিক পাঠ। সংক্ষিপ্ত অথচ তীক্ষ্ণ ভাষা, অভিনব চিত্রকল্প এবং দার্শনিক অন্তর্গত সুর এই কবিতাগুলোকে সমকালীন বাংলা কবিতার পাঠকের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তোলে।



পাঁচটি সূর্যাস্ত

দেবব্রত দাস


১. 

ভালোবাসলে দিগন্ত হেঁটে বাড়ি চলে আসবে জানি

নদীরাও স্থির দাঁড়িয়ে শুনবে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর গান । 

তবে এখনই ভালোবাসবো না

আরও কিছুটা সময় কাটাতে চাই ঘাসের বাড়িতে।


২. 

কবে তুমি পোয়াতী হবে? 

কিছুদিন পরই পঞ্চাশে পা দেবো

সারাপাড়ায় রটে যাওয়া

হৃদয়হীন সন্তানের অভিভাবক নামটা চিরতরে মুছে যাবে।


বলো কবে তুমি পোয়াতী হবে?


৩. 

কাগজে মেঘসর্বস্ব আকাশ আঁকলাম, পাখি আঁকলাম

এবার তাকে উল্টে দিতেই

বৃষ্টি ঝরে পড়লো শরীরে, উঠোনে, বাড়ির ছাদে


মূলত আমার ভাবনায় একটা উল্টো আকাশের খনি আছে।


৪. 

বাড়িজুড়ে সূর্যাস্তের ভিড়।

আমি ভিড় ঠেলে ভেতরে গিয়ে দেখলাম

মৃত রাত্রির মরদেহ পড়ে আছে

পাশেই নদীতীরে চিতা সাজাতে ব্যস্ত কয়েকজন।


৫.

সবকিছু সস্তায় মিলছে

টিভি, ফ্রিজ, আলমিরা, নারী, প্রেম

                               এমনকি ভদকাও।

শুধু দাম একটু বাড়তি আছে সবুজ শৈশব আর খয়েরী মৃত্যুর।


নেত্রবার্তা

সম্পাদক ও প্রকাশক : আর্কটুরাস
কপিরাইট © ২০২৬ নেত্রবার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত